কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৮ এ ০৭:০৬ PM

আমাদেরঅর্জনসমূহ

কন্টেন্ট: পাতা

সামাজিক বনায়নে অর্জিত সাফল্য

বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন গ্রামীণ জনপদে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র-বিমোচনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সেই সাথে সামাজিক বনায়ন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন উপশম ও অভিযোজন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বন বিভাগ ১৯৬০ দশকের শুরুর দিকে বন সমপ্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে সর্বপ্রথম বনায়ন কর্মসূচি বনাঞ্চলের বাইরে জনগণের কাছে নিয়ে যায়। অতঃপর ১৯৮১-৮২ সাল হতে উত্তরবঙ্গের সরকারী বনভূমিতে বনায়নের জন্য বৃহত্তর ৭টি জেলায় কমিউনিটি ফরেষ্ট্রী প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণে অংশীদারিত্বমূলক সামাজিক বনায়নের প্রচলন করে। সরকার ২০০০ সালে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমকে ১৯২৭ সালের বন আইনে অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে আইনি কাঠামোতে নিয়ে আসে। সামাজিক বনায়নকে আরও শক্তিশালী করার জন্য সরকার ২০০৪ সালে সামাজিক বনায়ন বিধিমালা প্রবর্তন করে। যাহা আরো কার্যকর ও সুযোপযোগী করার লক্ষ্যে ২০১১ সাল পর্যন্ত সংশোধনী আনা হয়। সংশোধিত বিধিমালায় সরকারী বন ভূমিতে বনায়নের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

বন বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়িত সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশে ১৯৮১-১৯৮২ সাল হতে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮৪,৩৭৮ হেক্টর এবং ৬৮,৮৩০ কিলোমিটার বাগান সৃজন করা হয়েছে। এছাড়া বিগত ৪ বছরে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড আওতাভূক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্পমেয়াদী ও নন-ম্যানগ্রোভ ২৯৫৫ হেক্টর ব্লক বনায়ন এবং সড়ক, রেলপথ ও বাঁধ সংযোগ সড়কে ২৬৪১ কি.মি. স্ট্রীপ বনায়ন করা হয়েছে। সৃজিত বাগানে প্রায় ৬ লক্ষ ৫২ হাজার ৯৫৫ জন উপকারভোগী সম্পৃক্ত রয়েছেন, যাদের মধ্যে মহিলা উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লক্ষ ২১ হাজার ৫০৭ জন । ২০০২ সাল হতে ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত সারাদেশে ব্যাপক বনায়নের লক্ষ্যে ১০ কোটি ১৫ লক্ষ ৪০ হাজার টি চারা বিক্রয় ও বিতরণ করা হয়েছে।

শুরু হতে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সামাজিক বনায়নের আওতায় ৩৪ হাজার ৭৪৪ হেক্টর এবং ১৪ হাজার ৫৫৩ কিলোমিটার বাগান কর্তন করা হয়েছে। উৎপাদিত কাঠ বিক্রয় করে ৯১৬ কোটি ২৬ লক্ষ ১৬ হাজার ৪ শত ২৬ টাকা পাওয়া গেছে। এযাবৎ ১ লক্ষ ৫১ হাজার ৯১৫ জন উপকারভোগীর মাঝে বিতরনকৃত লভ্যাংশের পরিমাণ ২৮৫ কোটি ৬৮ লক্ষ ৭৭ হাজার ৯৬৮ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত পুনঃ বনায়নের কাজে বৃক্ষরোপণ তহবিলে টিএফএফ (TFF) ৯১ কোটি ২০ লক্ষ ৭৪ হাজার ৩ শত ৩৬ টাকা পাওয়া যায়, যা থেকে ৫৬ কোটি ১৮ লক্ষ ৮১ হাজার ৩২ টাকা বনায়ন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ৩৫ কোটি ১ লক্ষ ৯৩ হাজার ৩ শত ৪ টাকা জমা রয়েছে। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে এ পর্যন্ত সরকারী রাজস্ব আয়ের পরিমাণ হয়েছে ৩৩১ কোটি ৮ লক্ষ ৭৯ হাজার ২ শত ৫৬ টাকা।

সহ-ব্যবস্থাপনায় অর্জিত সাফল্য

বাংলাদেশ সরকার USAID এর আর্থিক সহায়তায় দেশের ১৭টি Protected Area (রক্ষিত এলাকা) তে সহ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। সুন্দরবনের IRMP সহ ১৭ টি Protected Area এর সহ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন হয়েছে এবং সেগুলো ২৩ টি সহ ব্যবস্থাপনা সংগঠনের সহয়তায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। বর্তমানে USAID এর আর্থিক সহায়তায় আরো ৫ টি Protected Area তে সহ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে Protected Area এর পার্শ্ববর্তী জনসাধারণের অংশগ্রহণের ফলে জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের একটি সফল অধ্যায় সূচিত হয়েছে। Protected Area এর প্রাপ্ত রাজস্বের ৫০% সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে রক্ষিত এলাকা উন্নয়নের কাজ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৩৮.২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে।

বনাঞ্চলের রক্ষিত এলাকা সমূহ ব্যবস্থাপনার জন্য সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আওতায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে রক্ষিত এলাকার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এ পদ্ধতির কারণে পূর্বে যারা বন থেকে অবৈধভাবে সম্পদ আহরণের সুযোগ খূজতেন তারাই বনকর্মীদের সাথে বনজসম্পদ রক্ষা করছেন। রক্ষিত এলাকার ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়েছে, বনে পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। Grant Financing এর আওতায় রক্ষিত এলাকায় পর্যটন থেকে অর্জিত আয়ের ৫০% ল্যান্ডস্কেপ উন্নয়ন ও জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয় করা হচ্ছে। রক্ষিত এলাকা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, বন অপরাধ ও বনজসম্পদের পাচার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন

বন বিভাগ দেশের অবক্ষয়িত বন এবং অব্যবহৃত পতিত সরকারি ভূমিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এ পদ্ধতিতে এ যাবৎ বাংলাদেশে ২৬১ কোটি টাকার লভ্যাংশ ১,৩৩,০৮০ জন উপকারভোগীর মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। লভ্যাংশের অর্থ উপকারভোগী পরিবারের প্রায় ৬,৬৫,৪০০ জন সদস্যের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরটা অর্জনে সহায়তা করেছে। সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে উদ্ধারকৃত বনভূমি এবং সরকারী অব্যবহৃত পতিত জমিকে উৎপাদনমূখী করে ৭৭৫ কোটি টাকার গাছ বিক্রী করা হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গতিশীল হবার পাশাপাশি, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে যা দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে।

সামাজিক বনায়ন এবং সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আওতায় নারীদের সম্পৃক্তকরণঃ

বন বিভাগ পরিচালিত সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী নির্বাচনে সমাজের দুঃস্থ মহিলাদেরকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। উপকারভোগী ব্যক্তি বিবাহিত পুরুষ হলে তার স্ত্রীকেও উপকারভোগীর মর্যাদা প্রদান করা হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে সরকারি বনভূমিতে বনায়নের জন্য উপকারভোগী নির্বাচনের কমিটিতে আবেদনকারী জনগোষ্ঠীর ৫০% নারী প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে। সমগ্র দেশে সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশ প্রাপ্ত মোট ১,৩৩,০৮০ জন উপকারভোগীর মধ্যে প্রায় ৩০% নারী উপকারভোগী রয়েছেন। সারাদেশের কয়েকটি জেলায় কোন কোন সামাজিক বনায়নে ১০০% উপকারভোগী নারী সদস্যদের মধ্যে হতে নির্বাচন করা হয়েছে।

সমগ্র দেশের ১৬ টি রক্ষিত এলাকায় সহ-ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের ২০% নারী সদস্যের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। যারা কাউন্সিল সভায় সক্রিয় অংশ গ্রহণের মাধ্যমে নারী সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন। রক্ষিত এলাকার জন্য গঠিত পিপলস ফোরামের (PF) ৫০% বা ৭৩৩ টি পদ নারী সদস্যের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। রক্ষিত এলাকার সংলগ্ন গ্রামবাসীদের মধ্যে হতে ভিলেজ কনজারভেশন ফোরামের (VCF) এক তৃতীয়াংশ ৩৩% সদস্যপদ নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। ফলে ১৬,২৪০ জন নারী ভিলেজ কনজারভেশন ফোরাম সদস্য গ্রামবাসীকে বন সংরক্ষণ বিষয়ে প্রেরণা জোগানোর কাজ করছেন।

রক্ষিত এলাকা পাহারার জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে গঠিত কমিউনিটি পেট্রল গ্রুপেও নারী সদস্য অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। টেকনাফের মিসেস খুরশিদা বেগম বন পাহারায় নেতৃত্ব দিয়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রদত্ত ওয়াঙ্গারী মাথাই পুরষ্কার অর্জন করেছেন। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পুরস্কারঃ

১) সলুউশন সার্চ পুরষ্কার ২০১৩: পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কর্তৃক উপকূলীয় এলাকায় বাস্তবায়িত ‘কমিউনিটি বেজড এডাপটেশন টু ক্লাইমেট চেঞ্জ’ প্রকল্পটি “সলুউশন সার্চ: এডাপটিং টু এ ক্লাইমেট চেঞ্জ” প্রতিযোগিতার জন্য “রানার আপ” এওয়ার্ড পেয়েছে। এই উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় স্থানীয় সম্প্রদায় কিভাবে তাদের পরিবর্তিত পরিবেশে অভিযোজিত হয় তা অন্বেষণ করা হয়। প্রতিযোগিতায় সারা বিশ্বের ৩৭ টি দেশের ৮৫টিরও বেশিপ্রতিযোগি অংশগ্রহণ করেছে।

২) ইকুয়েটর পুরষ্কার ২০১২: চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি জাতিসংঘ ঘোষিত ইকুয়েটর পুরষ্কার ২০১২ অর্জন করেছে।

​৩)ওয়াঙ্গারী মাথাই পুরষ্কার ২০১২: কক্সবাজার জেলার টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও অবৈধ গাছ পাচার বন্ধে স্থানীয় জনগণ তথা মহিলাদের উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ে বিশেষ অবদানের জন্য টেকনাফ উপজেলার কেরানতলী গ্রামের বিধবা নারী খুরশিদা বেগম আন্তর্জাতিক এ পুরষ্কার অর্জন করেছেন।

৪) আর্থ কেয়ার পুরষ্কার ২০১২: পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কর্তৃক উপকূলীয় এলাকায় বাস্তবায়িত ‘কমিউনিটি বেজড এডাপটেশন টু ক্লাইমেট চেঞ্জ’ প্রকল্পের অধীনে বনায়নের সাথে যৌথভাবে মৎস্য ও ফল চাষ পদ্ধতি আন্তর্জাতিক ‘আর্থ কেয়ার’ পুরষ্কার অর্জন করেছে।

৫) ক্লাইমেট পুরস্কার ২০১২: টাঙ্গাইল বন বিভাগ মধুপুর বনে প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৭০০ পরিবারকে পুনর্বাসন করে বন রক্ষ্যার জন্য পুরস্কারটি গ্রহণ করে।

৬) জাতিসংঘের শ্রেষ্ঠ প্রকল্প ২০১২: উপকূলীয় এলাকায় বাস্তবায়িত ‘কমিউনিটি বেজড এডাপটেশন টু ক্লাইমেট চেঞ্জ’ প্রকল্পের আওতায় ভোলা জেলার চর কুকরী-মুকরীতে ডাইক পদ্ধতির বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সৃষ্টি প্রক্রিয়া জাতিসংঘের শ্রেষ্ঠ প্রকল্পের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন